রবিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৩, ০১:১৫ পূর্বাহ্ন

ইউএনও’র নামে ঘুষ গ্রহণ ও প্রতারণার অভিযোগে তাড়াশে ইউপি চেয়ারম্যান ও সচিবের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক :
  • সময় কাল : শুক্রবার, ৬ জানুয়ারী, ২০২৩
  • ২৬৫ বার পড়া হয়েছে

ডিস্ট্রিক ফ্যাসিলিটেটর (ডিএফ), উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও উপজেলা প্রকৌশলীর নাম ভাঙ্গানোসহ বিলের ফাইল প্রস্তুত করার কথা বলে কয়েক দফায় এলজিএসপি-৩ প্রকল্পের এক ঠিকাদারের কাছ থেকে অনৈতিকভাবে ৪ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়াসহ ২৬ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে ৩নং সগুনা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টু ও তৎকালীন সচিব বাসুদেব ঘোষের বিরুদ্ধে।

এ ঘটনায় প্রতারণার শিকার ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানটি তাদের পাওনাধি বুঝে না পাওয়ায় অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্তসহ দেউলিয়ায় পরিণত হয়েছে। ফলে নিরুপায় হয়ে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধি মোঃ কাইয়ুম আলী সেখ ন্যায় বিচারের স্বার্থে বুধবার (৪ জানুয়ারি) সিরাজগঞ্জ আমলী আদালতে সগুনা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টু ও তৎকালীন অতিরিক্ত সচিব বাসুদেব ঘোষের বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা দায়ের করেছেন। আদালতের বিচারক মামলাটি আমলে নিয়ে তদন্তের জন্য তাড়াশ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানটি সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করলে অভিযোগটি আমলে নিয়ে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালককে নির্দেশ দেন জেলা প্রশাসক।

বৃহস্পতিবার (৫ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় মামলা দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত করেন সিরাজগঞ্জ জেলা জজকোর্টের আইনজীবি মোঃ কামাল পারভেজ।

আদালতের মামলা ও জেলা প্রশাসক বরাবর অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, তাড়াশ উপজেলাধীন ৩নং সগুনা ইউনিয়নে ২০১৯-২০ অর্থ বছরে এলজিএসপি-৩ প্রকল্পের ৩১ লাখ ৩২ হাজার ৪৬০ টাকার বিপরীতে ১৪টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করার নিমিত্তে সিরাজগঞ্জ সদরের বহুলী ইউনিয়নের ‘মিম এন্টারপ্রাইজ’ নামক একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি কাইয়ুম আলী কাজগুলো সম্পন্ন করার জন্য ঠিকাদার হিসেবে মনোনীত হন। এর মধ্যে ১ লাখ ২৭ হাজার টাকায় লালুয়া মাঝিড়া কালকাতলা পানি নিস্কাশষনের জন্য ইউড্রেন স্থাপন, ১ লাখ টাকা ব্যয়ে চর কুশাবাড়ী ওমরের মোড় পানি নিস্কাশনের জন্য ইউড্রেন নির্মাণ, ১ লাখ টাকা ব্যয়ে গবাদি পশুর কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র স্থাপন, ১ লাখ টাকা ব্যয়ে কাটাবাড়ী মনির মেম্বারের বাড়ীর সামনে নদী নৌকাঘাট বাঁধাইকরণ, ১ লাখ টাকা ব্যয়ে ইশ্বরপুর খালেকের দোকান থেকে মহরের বাড়ী পর্যন্ত রাস্তা এইচবিএস সেলিংকরণ বরাদ্দ, ৫ লাখ ২৭ হাজার টাকা ব্যয়ে সগুনা আলাউদ্দিনের বাড়ীর সামনে পানি নিস্কাশনের জন্য ইউড্রেন, কুন্দইল পাকা রাস্তা থেকে সোহেলের বাড়ী পর্যন্ত রাস্তায় এইচবিএস সেলিংকরণ, ২ লাখ টাকা ব্যয়ে ধাপতেতুলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১০ জোড়া মাকড়সন জহির উদ্দিন কারিগরি স্কুলের ১৫ জোড়া ফাইবার পিভিসি বেঞ্চ সরবরাহ, ৬০ হাজার টাকা ব্যয়ে কোভিড-১৯ উপকরণ সরবরাহ, ১ লাখ টাকা ব্যয়ে নয়টি কমিউনিটি নলক‚প স্থাপন, ২ লাখ টাকা ব্যয়ে কুন্দল বাজারে ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ড স্থাপন, ১ লাখ ৩৬ হাজার টাকা ব্যয়ে সগুনা ইউনিয়নের প্রতিবন্ধিদের জন্য ২৫টি হুইল চেয়ার সরবরাহ, ৬ লাখ ৬৫ হাজার টাকা ব্যয়ে ইক্সকিউটিভ চেয়ার ১টি, ২৩টি টেবিল ও ১০ জোড়া করে ফাইল, পিভিসি বেঞ্চ বরাদ্দ ও ৬ লাখ ১৫ হাজার টাকা ব্যয়ে কুন্দইল ব্রিজ থেকে মামুনের বাড়ী পর্যন্ত রাস্তা বিএফসিকরণ। এই সকল প্রকল্পের কাজগুলো প্রাপ্ত হওয়ার পর ২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানটি তাঁর নিজ অর্থায়নে দুটি প্রকল্পের আংশিক কাজসহ ১২টি প্রকল্পগুলোর কাজ বাস্তবায়ন করেন।

এরমধ্যে আংশিক কাজ করা ৬ লাখ ৬৫ হাজার টাকা ব্যয়ে ইক্সকিউটিভ চেয়ার ১টি, ২৩টি টেবিল ও ১০ জোড়া করে ফাইল, পিভিসি বেঞ্চ বরাদ্দ ও ৬ লাখ ১৫ হাজার টাকা ব্যয়ে কুন্দইল ব্রিজ থেকে মামুনের বাড়ী পর্যন্ত রাস্তা বিএফসিকরণ কাজ সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যান তার ক্ষমতার অপব্যবহার করে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানটিকে দিয়ে কাজ না করিয়ে নিজেই কাজ দুটি নামমাত্র বাস্তবায়ন দেখিয়ে ১২ লাখ ৮০ হাজার টাকা অর্থ আত্মসাত করেন।

মামলায় ভুক্তভোগী ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি মামলা ও অভিযোগে আরও উল্লেখ করেন, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানটি ১২টি প্রকল্পের কাজ শতভাগ বাস্তবায়ন করে সগুনা ইউনিয়ন পরিষদ বরাবর তাদের প্রাপ্য ১৮ লাখ ৫১ হাজার ৩৩৮ টাকার বিলের জন্য আবেদন করেও প্রতারিত হন। সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টু ও তৎকালীন অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিব বাসুদেব ঘোষ ১২টি প্রকল্পের বরাদ্দকৃত ১৮ লাখ ৫১ হাজার ৩৩৮ টাকার বিল ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে প্রদান না করে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার জন্য নানা তালবাহানা করতে থাকেস। এরই এক পর্যায়ে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধি মোঃ কাইয়ুম আলী সেখের নিকট থেকে ডিস্ট্রিক ফ্যাসিলিটেটর (ডিএফ), উপজেলা নির্বাহী অফিসার, উপজেলা প্রকৌশলীর নাম ভাগিয়ে এবং বিলের ফাইল প্রস্তুত করার কথা বলে কয়েক দফায় এককভাবে প্রতারণামূলকভাবে অনৈতিক পন্থায় ৪ লাখ টাকা গ্রহণ করেন তৎকালীন অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিব বাসুদেব ঘোষ। এদিকে ঘুষ গ্রহণের পরও ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানটির পাওনাকৃত ১৮ লাখ ৫১ হাজার ৩৩৮ টাকার বিলের মধ্যে চেয়ারম্যান ও অতিরিক্ত সচিব পরপরস্পর যোগসাজশ করে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানটিকে ৮ লাখ ৯৩ হাজার ৫৮৬ টাকা প্রদান করেন এবং বাকী ৯ লাখ টাকা ৫৭ হাজার ৭৩২ টাকার প্রাপ্ত বিল সুকৌশলে আত্মসাত করার উদ্দেশ্যে পরে দেবেন বলে জানান। সেই বিলের জন্য একাধিকবার তাগাদা দিয়েও বিল ছাড় করতে ব্যর্থ হন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি মোঃ কাইয়ুম আলী সেখ।

এদিকে বিলের জন্য বার বার ঘোরার পর ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি জানতে পারেন, তাঁর পাওনাকৃত সেই বিলের ৯ লাখ ৫৭ হাজার ৭৩২ টাকা প্রতারণার মাধ্যমে উত্তোলন করে আত্মসাত করেছেন চেয়ারম্যান ও তৎকালীন সচিব। শুধু তাই নয় ইউপি চেয়ারম্যান ও সচিব পরপরস্পর যোগসাজশ করে ২০২০-২১ অর্থ বছরের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দকৃত দুটি প্রকল্প তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে ছিনিয়ে নিয়েছেন। পরে ছিনিয়ে নেওয়া প্রকল্প দুটির বরাদ্দকৃত ৬ লাখ ৬৫ হাজার টাকার (ইক্সকিউটিভ চেয়ার ১টি, ২৩টি টেবিল, ১০ জোড়া করে ফাইল, পিভিসি বেঞ্চ বরাদ্দ) ও ৬ লাখ ১৫ হাজার টাকার (কুন্দইল ব্রিজ থেকে মামুনের বাড়ী পর্যন্ত রাস্তা বিএফসিকরণ) কাজ নামমাত্র করে ১২ লাখ ৮১ হাজার ১২২ টাকা আত্মসাত করেন। উল্লেখিত প্রকল্প দুটির আংশিক কাজ করেছিলেন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মিম এন্টারপ্রাইজ। অথচ ক্ষমতার অপব্যবহার করে সেই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানটিকে আংশিক বিলও প্রদান করা হয়নি।

এ বিষয়ে একাধিকবার চেষ্টা তদবিরের পরেও ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটি তাদের পাওনাধি আজও বুঝে পাননি। এতে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানটি ক্ষতিগ্রস্তসহ দেউলিয়ায় পরিণত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত নিরুপায় হয়ে পাওনাদি ফেরতের স্বার্থে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি মোঃ কাইয়ুম আলী সেখ বাদী হয়ে গত বুধবার (৪ জানুয়ারি) আমলী আদালত তাড়াশ থানা সিরাজগঞ্জে সগুনা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টু ও তৎকালীন অতিরিক্ত সচিব বাসুদেব ঘোষের বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা দায়ের করেছেন। আদালতের বিচারক মামলাটি আমলে নিয়ে তদন্তের জন্য তাড়াশ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানটি সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। এতে অভিযোগটি আমলে নিয়ে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালককে নির্দেশ দেন জেলা প্রশাসক।

নিউজটি শেয়ার করুন....

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ বিভাগের আরও খবর
এই নিউজ পোর্টাল এর  কোন লেখা,ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি ও দণ্ডনীয় অপরাধ।
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102